সব শঙ্কা উড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৬ বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছে ইরান: ফিফার অনড় অবস্থান

Image 70

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির ভূ-রাজনীতি আর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান স্নায়ুযুদ্ধের প্রভাবে ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপে ইরানের অংশগ্রহণ নিয়ে যে ঘন কুয়াশা তৈরি হয়েছিল, তার অবসান ঘটালেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা সাফ জানিয়ে দিয়েছে, কোনো রাজনৈতিক চাপ বা ভেন্যু পরিবর্তনের দাবি গ্রহণ করা হবে না। অর্থাৎ, পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী মার্কিন মুলুকেই ফুটবল যুদ্ধে লড়বে ইরান। ফিফার এই ঘোষণা কেবল ফুটবল ভক্তদের জন্যই স্বস্তির নয়, বরং এটি বৈশ্বিক ক্রীড়াঙ্গনে রাজনীতির প্রভাবমুক্ত রাখার একটি বড় বার্তা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

"ইরান অবশ্যই বিশ্বকাপে খেলবে": জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর দ্ব্যর্থহীন বার্তা

সম্প্রতি সিএনবিসি (CNBC) আয়োজিত একটি অর্থনৈতিক সম্মেলনে ফিফা বস জিয়ান্নি ইনফান্তিনো স্পষ্ট ভাষায় ইরানের অংশগ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। বিশ্বজুড়ে চলা নানা জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে তিনি বলেন, “ইরান কেবল একটি ফুটবল দল নয়, তারা একটি বিশাল জাতির প্রতিনিধি। তারা মাঠের লড়াইয়ে যোগ্যতা অর্জন করেই চূড়ান্ত পর্বে জায়গা করে নিয়েছে। তাই তাদের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ নিশ্চিত।”

ইনফান্তিনো আরও যোগ করেন যে, ফুটবল এবং রাজনীতিকে আলাদা রাখা বর্তমান বিশ্বের জন্য অত্যন্ত জরুরি। তিনি একটি তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করে বলেন, “বিশ্বের অন্য কোনো পক্ষ যদি দেশগুলোর মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরিতে ব্যর্থ হয়, তবে ফিফা সেই ফুটবলীয় সম্প্রীতির দায়িত্ব পালন করবে।” মূলত ইরানের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে যে বয়কটের গুঞ্জন উঠেছিল, এই বক্তব্যের মাধ্যমে তা পুরোপুরি নাকচ করে দিলেন ফিফা প্রধান।

ভেন্যু বদলানোর আবেদন নাকচ: অনড় অবস্থানে ফিফা

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে ইরানের সামরিক সংঘাতের পর পরিস্থিতি চরম উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে ইরান ফুটবল ফেডারেশন তাদের ম্যাচগুলো যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশ মেক্সিকোতে নেওয়ার আনুষ্ঠানিক অনুরোধ করেছিল। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি মন্তব্য করেন। তিনি ইরানি খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন, যা অনেক বিশ্লেষক ইরানের অংশগ্রহণে বাধা হিসেবে দেখেছিলেন।

তবে ফিফা তাদের সিদ্ধান্তে একচুলও নড়েনি। গত মার্চ মাসেও তুরস্কে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ইনফান্তিনো দৃঢ়তার সাথে বলেছিলেন, "ড্র অনুযায়ী নির্ধারিত ভেন্যুতেই খেলা হবে, এর কোনো নড়চড় হবে না।" ফিফার এই কঠোর অবস্থানের ফলে ইরানকে এখন তাদের গ্রুপ পর্বের সবকটি ম্যাচই যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে খেলতে হবে।

এক নজরে ইরানের গ্রুপ পর্বের সময়সূচি (২০২৬ বিশ্বকাপ)

২০২৬ বিশ্বকাপের আসর বসছে যৌথভাবে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে। তবে ইরান তাদের ভাগ্য পরীক্ষার জন্য বেছে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মাঠগুলোকেই। ফিফার সূচি অনুযায়ী ইরান গ্রুপ পর্বে তিনটি ম্যাচ খেলবে:

  • প্রথম ম্যাচ: লস অ্যাঞ্জেলেস, যুক্তরাষ্ট্র।
  • দ্বিতীয় ম্যাচ: হিউস্টন, যুক্তরাষ্ট্র।
  • তৃতীয় ম্যাচ: মায়ামি, যুক্তরাষ্ট্র।

যুদ্ধ ও কূটনীতির মাঝে ফুটবলের জয়

২০২৬ সালের ৮ এপ্রিল একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার অর্থনৈতিক যুদ্ধ এখনো বিদ্যমান। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখা এবং ইরানি বন্দরের ওপর ওয়াশিংটনের নতুন নিষেধাজ্ঞার ফলে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক বর্তমানে তলানিতে ঠেকেছে। যুদ্ধের দামামা এবং অর্থনৈতিক অবরোধের এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির মাঝেই ফিফা আশা করছে যে, জুনের ফুটবল মহোৎসব চলাকালীন পরিবেশ শান্ত থাকবে।

ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, ফিফা যদি এই ক্ষেত্রে নমনীয় হতো, তবে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টগুলোতে রাজনৈতিক প্রভাব আরও বেড়ে যেত। তাই ফিফার এই কঠোর অবস্থান বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে একটি ইতিবাচক উদাহরণ হয়ে থাকবে। ফুটবল এখানে কেবল একটি খেলা নয়, বরং দুই শত্রু দেশের মাঝে শান্তির দূত হিসেবে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে।

সবশেষে এটি স্পষ্ট যে, ফুটবলের চিরন্তন আবেদন কোনো সীমানা বা সামরিক বাধা মানে না। ইরানের খেলোয়াড়দের যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে খেলতে আসা কেবল একটি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ নয়, বরং এটি বৈশ্বিক ঐক্যের এক প্রতীক। ট্রাম্প প্রশাসনের নিরাপত্তা উদ্বেগ আর তেহরানের ভেন্যু পরিবর্তনের দাবি—সবকিছু ছাপিয়ে জয় হয়েছে ফুটবলের। এখন দেখার বিষয়, আগামী জুনে যুক্তরাষ্ট্রের গ্যালারিতে যখন ইরানি সমর্থকরা উল্লাস করবেন, তখন মাঠের বাইরের বৈরিতা কতটা ফিকে হয়ে আসে। বিশ্ববাসী এখন তাকিয়ে আছে এক রোমাঞ্চকর এবং রাজনীতিমুক্ত বিশ্বকাপের দিকে।

আরও পড়ুন: বিশ্বকাপ বয়কটের পথে ইরান? যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভেন্যু না সরালে ফুটবল যুদ্ধে নামবে না 'টিম মেল্লি'!

সম্পর্কিত পোস্ট

Dingi News

ডিঙ্গি নিউজ একটি আধুনিক অনলাইন সংবাদ মাধ্যম যা বাংলাদেশের ও বিশ্বজুড়ে দ্রুত, সঠিক এবং নির্ভরযোগ্য খবর পৌঁছে দেয়। আমরা জাতীয়, আন্তর্জাতিক, রাজনীতি, খেলা, প্রযুক্তি এবং অন্যান্য সম্পর্কিত খবর সহজভাবে উপস্থাপন করি।

আমাদের সাথে থাকুন