জুলাই বিপ্লবের চেতনা ও গণভোটের দাবিতে রাজু ভাস্কর্যে আমরণ অনশন: শিক্ষার্থীদের পাশে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী

Image 60

জুলাই বিপ্লবের মূল আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন এবং গণভোটের মাধ্যমে প্রাপ্ত জনরায় কার্যকর করার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে আমরণ অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন তিন লড়াকু শিক্ষার্থী। আন্দোলনের দ্বিতীয় দিনেও দাবির সপক্ষে অনড় অবস্থানে রয়েছেন তাঁরা। বৃহস্পতিবার রাতে শিক্ষার্থীদের এই দাবির প্রতি পূর্ণ সংহতি জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। এই অনশনকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এক নতুন ছাত্র আন্দোলনের আবহ তৈরি হয়েছে, যা জুলাই বিপ্লবের অসমাপ্ত সংস্কারের দাবিকে পুনরায় সামনে নিয়ে এসেছে।

"ব্যক্তি নয়, সিস্টেমের পরিবর্তন প্রয়োজন": নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী

বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে উপস্থিত হয়ে অনশনরত শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। এ সময় সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক কাঠামো নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, "বাংলাদেশের মানুষ কোনো বিশেষ দলকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সংস্কারের জন্য জুলাই বিপ্লব ঘটিয়েছিল। গণভোটের রায় নিয়ে কোনো প্রকার টালবাহানা করার সুযোগ নেই।"

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী আরও যোগ করেন, "আমাদের বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামোটি মূলত একটি ফ্যাসিস্ট কাঠামো। এই সিস্টেমে আপনি যাকে ইচ্ছা তাকে বসান, সে-ই শেষ পর্যন্ত ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠবে। তাই ব্যক্তি পরিবর্তন নয়, বরং আমাদের শাসনব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। সংস্কারকে পাশ কাটিয়ে কোনো দলকে সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করা হলে জনগণ তা রাজপথেই প্রতিহত করবে।" তাঁর এই বক্তব্য উপস্থিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনার সৃষ্টি করে।

অনশনে থাকা তিন লড়াকু শিক্ষার্থীর অটল মনোবল

গত বুধবার থেকে শুরু হওয়া এই আমরণ অনশনে অনড় রয়েছেন তিন শিক্ষার্থী। তাঁরা হলেন:
১. মো. সাদিক মুনওয়ার মুনেম: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের (২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষ) শিক্ষার্থী এবং মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল সংসদের কার্যনির্বাহী সদস্য।
২. সাকিবুর রহমান: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের (২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষ) শিক্ষার্থী।
৩. শেখ মোস্তাফিজ: নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডিয়া কমিউনিকেশন ও জার্নালিজম বিভাগের শিক্ষার্থী।

অনশনরত শিক্ষার্থী সাদিক মুনওয়ার মুনেম তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, "অনশনের ২৩ ঘণ্টা পার হয়েছে। শরীর নিস্তেজ হয়ে এলেও সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন আমাদের মনোবল বাড়িয়ে দিয়েছে। গণরায়ের প্রতিফলন না ঘটা পর্যন্ত আমরা এক চুলও নড়ব না।" দীর্ঘক্ষণ অভুক্ত থাকায় তাঁদের শরীরে ক্লান্তি ছাপ ফেললেও লড়াইয়ের চেতনা এখনও অমলিন।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পরিদর্শন ও সাংস্কৃতিক সংহতি

বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টায় শিক্ষার্থীদের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিতে আসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক সাইফুদ্দিন আহমেদ। তিনি শিক্ষার্থীদের দাবির যৌক্তিকতা স্বীকার করে বলেন, "এটি একটি মীমাংসিত (Settled) বিষয়। গণভোটের রায় যা আসবে, সরকার তা বাস্তবায়ন করবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা। আমি বিশ্বাস করি, সরকার জনগণের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে।" প্রক্টরের এই আশ্বাসে শিক্ষার্থীরা ইতিবাচক সাড়া দিলেও দাবি বাস্তবায়নের দৃশ্যমান পদক্ষেপ না আসা পর্যন্ত অনশন ভাঙতে অস্বীকৃতি জানান।

এর আগে সন্ধ্যা ৭টায় শিক্ষার্থীদের দাবির সমর্থনে রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে 'জুলাই' নামক একটি মূক নাটক মঞ্চস্থ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)। নাটকের মাধ্যমে জুলাই বিপ্লবের ত্যাগ, বীরত্বগাথা এবং ছাত্র-জনতার রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ফুটিয়ে তোলা হয়। এই সাংস্কৃতিক সংহতি ক্যাম্পাসের সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক সংবেদনশীলতা তৈরি করেছে।

স্বাস্থ্য ঝুঁকি ও বর্তমান পরিস্থিতি

রাত পৌনে ১১টার দিকে অনশনরত শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারের একটি চিকিৎসক দল ঘটনাস্থলে পৌঁছান। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকায় শিক্ষার্থীদের রক্তচাপ কমে গেছে এবং তীব্র শারীরিক দুর্বলতা দেখা দিয়েছে। তবে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কোনো ধরণের চিকিৎসা নিতে বা স্যালাইন গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।

বর্তমানে রাজু ভাস্কর্য এলাকা সাধারণ শিক্ষার্থীদের আনাগোনায় মুখরিত। ব্যানার, ফেস্টুন আর শ্লোগানে মুখর এই চত্বর থেকে জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের শপথ নিচ্ছেন তরুণরা। গভীর রাতেও অনেক শিক্ষার্থীকে অনশনরতদের পাশে অবস্থান নিতে দেখা গেছে।

রাজু ভাস্কর্যের এই অনশন কর্মসূচি কেবল তিন শিক্ষার্থীর আন্দোলন নয়, বরং এটি জুলাই বিপ্লবের পরবর্তী রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতি সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যাকুলতার বহিঃপ্রকাশ। নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, বিষয়টি এখন আর কেবল ক্যাম্পাসের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন কতটা জরুরি, তা এই শিক্ষার্থীদের লড়াই বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে। দ্রুত সমাধান না এলে অনশনরত শিক্ষার্থীদের শারীরিক অবস্থা আরও অবনতির দিকে যেতে পারে, যা সরকারের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।

আরও পড়ুন: বিচার বিভাগ ও গুম প্রতিরোধে শক্তিশালী বিল আনছে সরকার: সংসদে ১৬ অধ্যাদেশ বাতিলের নেপথ্য কারণ

সম্পর্কিত পোস্ট

Dingi News

ডিঙ্গি নিউজ একটি আধুনিক অনলাইন সংবাদ মাধ্যম যা বাংলাদেশের ও বিশ্বজুড়ে দ্রুত, সঠিক এবং নির্ভরযোগ্য খবর পৌঁছে দেয়। আমরা জাতীয়, আন্তর্জাতিক, রাজনীতি, খেলা, প্রযুক্তি এবং অন্যান্য সম্পর্কিত খবর সহজভাবে উপস্থাপন করি।

আমাদের সাথে থাকুন