সংস্কার না হওয়া পর্যন্ত মাঠ ছাড়বে না ১১ দল: বিএনপি সরকারকে কঠোর হুঁশিয়ারি

Image 51

দেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও সাংবিধানিক সংস্কার পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত রাজপথে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে জামায়াতে ইসলামীসহ ১১টি রাজনৈতিক দলের জোট। শনিবার বিকেলে রাজধানীর বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে আয়োজিত এক বিক্ষোভ সমাবেশে জোটের নেতারা এই দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করেন। নবনির্বাচিত বিএনপি সরকারের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে তাঁরা বলেন, সংস্কার প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে যদি দেশে পুনরায় ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়, তবে তার চরম মূল্য দিতে হবে বর্তমান সরকারকে। জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা ধারণ করে রাষ্ট্র পুনর্গঠনই এখন সময়ের প্রধান দাবি বলে মনে করছেন জোটের শীর্ষ নেতারা।

গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি ও সাংবিধানিক সংকট

‘গণভোটের জনরায়ের বিরুদ্ধে সরকারি অবস্থানের প্রতিবাদ’ এবং ‘দ্রুত গণরায় কার্যকর করার’ দাবিতে মূলত এই বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করা হয়। সমাবেশে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, “জনগণ যে সংস্কার চায়, তা বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আমরা রাজপথ ছাড়ব না। সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ গ্রহণ না করে বিএনপি মূলত গণভোটের রায় ও পুরো জাতিকে অবমাননা করেছে।”

তিনি আরও জানান, সরকার যদি জনস্বার্থে কাজ করে তবে তারা সহযোগিতা পাবে, নতুবা সংসদ ও রাজপথ—উভয় জায়গাতেই তাদের কঠোর প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হবে। ১১ দলের এই অবস্থান মূলত বর্তমান সরকারের সাথে তাদের সম্পর্কের টানাপোড়েনকে প্রকাশ্য রূপ দিল।

বিএনপির ‘সুবিধাবাদী’ রাজনীতির তীব্র সমালোচনা

সমাবেশে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক তাঁর বক্তব্যে বিএনপির রাজনৈতিক কৌশলের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপি কেবল সেসব অধ্যাদেশ বা নিয়ম পছন্দ করছে যা তাদের ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে সাহায্য করে। কিন্তু জনগণের কাছে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে এমন সংস্কারের প্রতি তাদের অনাগ্রহ প্রকট। একে তিনি ‘নিছক সুবিধাবাদের রাজনীতি’ বলে অভিহিত করেন।

মাওলানা মামুনুল হক আরও যোগ করেন, “৭০ শতাংশ মানুষের মতের বিপক্ষে গিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবে না। বিগত ২৫ বছর আপনাদের ভুলের খেসারত আমাদের দিতে হয়েছে। গুম ও খুনের রাজনীতির শিকার হতে হয়েছে আমাদের। তাই সতর্ক করছি, জনরায়কে শ্রদ্ধা করুন, অন্যথায় রাজপথে মোকাবিলা হবে।” তাঁর এই বক্তব্যে জুলাই বিপ্লবের পরবর্তী রাজনৈতিক মেরুকরণ ও জোটবদ্ধ শক্তির ক্রমবর্ধমান প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব আখতার হোসেন অভিযোগ করেন, বিএনপি রাষ্ট্রীয় সব প্রতিষ্ঠানকে এক ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায় বলেই তারা আমূল সংস্কারের বিরোধিতা করছে। খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আহমদ আবদুল কাদের মন্তব্য করেন, বিএনপি বর্তমানে পরোক্ষভাবে ফ্যাসিবাদের পথ অনুসরণ করছে, যার বিরুদ্ধে এখনই রুখে দাঁড়ানো জরুরি।

সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে জামায়াতের নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম বলেন, “জুলাই বিপ্লবকে অস্বীকার করা মানে আমাদের নতুন জীবনকে অস্বীকার করা। এই আন্দোলন কোনো নির্দিষ্ট দলের বিরুদ্ধে নয়, বরং ক্ষমতা কুক্ষিগত করার মানসিকতার বিরুদ্ধে।” তিনি স্পষ্ট করেন যে, স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশে নতুন কোনো একনায়কতন্ত্রের জায়গা হবে না।

বিক্ষোভ মিছিল ও রাজপথের উত্তাপ

সমাবেশ শেষে বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেট থেকে একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে কাকরাইল মোড়ে গিয়ে শেষ হয়। মিছিলে নেতাকর্মীরা ‘সংস্কার চাই’, ‘জুলাই সনদ মানতে হবে’ এবং ‘গণভোটের রায় কার্যকর করো’—এ জাতীয় বিভিন্ন স্লোগান দেন। মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের উপস্থিতি এবং গগনবিদারী শ্লোগান প্রমাণ করে যে, সংস্কারের দাবিটি এখন আর কেবল ড্রয়িংরুমের আলোচনা নয়, বরং এটি রাজপথের মূল এজেন্ডা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সমাবেশে এলডিপি, জাগপা, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি এবং নেজামে ইসলাম পার্টির শীর্ষ নেতারাও সংহতি প্রকাশ করে বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন শফিকুল ইসলাম মাসুদ ও রেজাউল করিমসহ জোটের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ১১ দলের এই কঠোর অবস্থান বিএনপি সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। একদিকে সরকার গঠনের পর স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চাপ, অন্যদিকে রাজপথের শক্তিগুলোর সংস্কারের দাবি—এই দ্বিমুখী সংকটে বর্তমান প্রশাসনকে বেশ সতর্ক হয়েই পা ফেলতে হবে। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং সাংবিধানিক সংস্কারের প্রশ্নে সরকার ও এই ১১ দলীয় জোটের মধ্যে সমঝোতা না হলে আগামী দিনগুলোতে রাজপথে সংঘাত ও উত্তাপ আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। জুলাই বিপ্লবের শহীদদের রক্তস্নাত বাংলাদেশে গণতন্ত্রের পূর্ণ বিকাশ ঘটে কি না, তা এখন নির্ভর করছে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও দূরদর্শিতার ওপর।

আরও পড়ুন: বিচার বিভাগ ও গুম প্রতিরোধে শক্তিশালী বিল আনছে সরকার: সংসদে ১৬ অধ্যাদেশ বাতিলের নেপথ্য কারণ

সম্পর্কিত পোস্ট

Dingi News

ডিঙ্গি নিউজ একটি আধুনিক অনলাইন সংবাদ মাধ্যম যা বাংলাদেশের ও বিশ্বজুড়ে দ্রুত, সঠিক এবং নির্ভরযোগ্য খবর পৌঁছে দেয়। আমরা জাতীয়, আন্তর্জাতিক, রাজনীতি, খেলা, প্রযুক্তি এবং অন্যান্য সম্পর্কিত খবর সহজভাবে উপস্থাপন করি।

আমাদের সাথে থাকুন