ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা ব্যর্থ: ট্রাম্পের সামনে এখন কোন পথ? যুদ্ধের আশঙ্কায় কাঁপছে বিশ্ববাজা

Image 63

দক্ষিণ এশিয়ার প্রাণকেন্দ্র ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বহুল প্রতীক্ষিত শান্তি আলোচনা কোনো সুনির্দিষ্ট সমাধান ছাড়াই ভেঙে গেছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বিশ্ববাসী একটি সমঝোতার আশা করলেও, দুই পক্ষই তাদের অবস্থানে অনড় থাকায় আলোচনা টেবিল থেকে শূন্য হাতে ফিরতে হয়েছে কূটনীতিকদের। ২১ এপ্রিল দুই সপ্তাহের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হতে চললেও দুই পক্ষ এখনো আলোচনার টেবিলে ফেরার কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না। এই চরম অচলাবস্থায় বিশ্বজুড়ে এখন একটাই প্রশ্ন—প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে বিকল্প আর কী আছে? তিনি কি যুদ্ধের পথে হাঁটবেন, নাকি নতুন কোনো কূটনৈতিক চাল দেবেন?

ট্রাম্পের প্রধান হাতিয়ার: সামরিক হুমকির বাস্তবতা কতটুকু?

ইসলামাবাদ আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ট্রাম্পের হাতে থাকা সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো পুনরায় ভয়াবহ সামরিক অভিযান শুরুর হুমকি। তবে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই হুমকি যতটা না সামরিক, তার চেয়ে বেশি মনস্তাত্ত্বিক। ২১ এপ্রিলের সময়সীমা যত ঘনিয়ে আসবে, ওয়াশিংটন থেকে হামলার হুমকি তত বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে রাজনৈতিকভাবে ট্রাম্পের জন্য এটি একটি পিচ্ছিল পথ। কারণ, ইরানিরা ভালো করেই জানে যে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিতে বড় কোনো পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে জড়ানো ট্রাম্পের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে। ট্রাম্প একদিকে যেমন তাঁর সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে চান, তেমনি মার্কিন ভোটারদের কাছে 'অন্তহীন যুদ্ধ' বন্ধের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তারও একটি চাপ রয়েছে। ফলে সামরিক হুমকি এখন ট্রাম্পের জন্য এক দুইধারী তলোয়ারে পরিণত হয়েছে।

হরমুজ প্রণালি ও বিশ্ব অর্থনীতিতে ‘রেড অ্যালার্ট’

বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ যাতায়াত করে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে। ইরান এই পথটি আংশিক বা পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্বব্যাপী জ্বালানি অস্থিরতা চরমে পৌঁছেছে। গত সপ্তাহে ট্রাম্প যে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছিলেন, তার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল এই সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখা। তবে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ায় এর প্রভাব একাধিক খাতে লক্ষ্য করা যাচ্ছে:

পণ্য সংকট: কেবল জ্বালানি তেল নয়, আধুনিক প্রযুক্তির সেমিকন্ডাক্টর ও কৃষির জন্য অপরিহার্য সার তৈরির হিলিয়াম গ্যাসের তীব্র ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

মুদ্রাস্ফীতি: যুক্তরাষ্ট্রে মুদ্রাস্ফীতি ইতিমধ্যে ৩.৩ শতাংশে পৌঁছেছে। যুদ্ধ পুনরায় শুরু হলে পণ্যমূল্য বাড়ার ফলে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

শেয়ারবাজার: একটি সম্ভাব্য চুক্তির আশায় শেয়ারবাজার কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু সমঝোতা না হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এখন চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।

ইরানের কঠিন শর্ত ও দর কষাকষির কৌশল

ইরান এখন তাদের কৌশল বদলেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি কোনো বড় ইস্যু না থাকলেও, বর্তমান পরিস্থিতিতে এটিই তাদের প্রধান দর কষাকষির হাতিয়ার বা 'লেভারেজ'। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তিনটি কঠোর শর্ত জুড়ে দিয়েছে:
১. ক্ষয়ক্ষতি পূরণ: মার্কিন বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইরানের যে বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে, তার নগদ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
২. নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: গত দুই দশক ধরে চলা সব ধরণের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা একবারে তুলে নিতে হবে।
৩. স্থায়ী যুদ্ধবিরতি: ইরানের ভূখণ্ড ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে সব ধরণের সামরিক তৎপরতার স্থায়ী অবসান ঘটাতে হবে।

ওয়াশিংটন ক্ষতিপূরণের দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করলেও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে 'ধাপে ধাপে' কার্যকর করার প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু তেহরান 'সব অথবা কিছুই না' নীতিতে অটল থাকায় সংকট ঘনীভূত হয়েছে।

অচলাবস্থার নেপথ্যে: 'বিজয়ী' হওয়ার মানসিকতা

ইসলামাবাদ আলোচনার ব্যর্থতা প্রমাণ করেছে যে, দুই পক্ষই নিজেদের 'বিজয়ীর' আসনে বসিয়ে রেখেছে। ওয়াশিংটনের ধারণা, সাম্প্রতিক বিমান হামলার মাধ্যমে তারা ইরানের সামরিক কাঠামোর কোমর ভেঙে দিয়েছে, তাই তেহরান নতি স্বীকার করবে। অন্যদিকে, তেহরানের বিশ্বাস—বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর ভয়াবহ হামলার মুখে সম্পূর্ণ ধ্বংস না হয়ে টিকে থাকতে পারাই তাদের নৈতিক ও কৌশলগত বিজয়। এই 'বিজয়ীর অহম' কোনো পক্ষকেই নমনীয় হতে দিচ্ছে না।

মধ্যপ্রাচ্য এখন এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ধাবিত হচ্ছে। ২১ এপ্রিলের সময়সীমা পার হওয়ার পর যদি নতুন কোনো যুদ্ধবিরতি বা আলোচনার পথ তৈরি না হয়, তবে পুরো অঞ্চলটি এক ভয়াবহ আঞ্চলিক যুদ্ধের দাবানলে পুড়ে যেতে পারে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে এখন সুযোগ খুবই সীমিত—হয় তাকে নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে আরও বড় ছাড় দিতে হবে, নতুবা একটি ব্যয়বহুল ও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের দায়ভার নিতে হবে। বিশ্ব অর্থনীতি ও বৈশ্বিক শান্তি এখন ইসলামাবাদ থেকে ওয়াশিংটন পর্যন্ত বিস্তৃত এক সরু সুতার ওপর ঝুলে আছে।

আরও পড়ুন: ৪৭ বছর পর ইসলামাবাদে মুখোমুখি বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান

সম্পর্কিত পোস্ট

Dingi News

ডিঙ্গি নিউজ একটি আধুনিক অনলাইন সংবাদ মাধ্যম যা বাংলাদেশের ও বিশ্বজুড়ে দ্রুত, সঠিক এবং নির্ভরযোগ্য খবর পৌঁছে দেয়। আমরা জাতীয়, আন্তর্জাতিক, রাজনীতি, খেলা, প্রযুক্তি এবং অন্যান্য সম্পর্কিত খবর সহজভাবে উপস্থাপন করি।

আমাদের সাথে থাকুন